কারিগরি শিক্ষা খাতে অনিশ্চয়তা

বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ উন্নতির পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকারে সুযোগ্য কর্মপরিকল্পনায়।কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এবং কিছু আজব নিয়মের বেড়াজালে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই উন্নতি থমকানোর উপক্রম হয়েছে। তার মাঝে অন্যতম শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “স্কিলস এ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট” (STEP)।এই প্রজেক্ট এর আওতায় বিভিন্ন সরকারি পলিটেকনিক, মনোটেকনিক, গ্লাস এন্ড সিরামিকস, বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজিতে জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর, ইনস্ট্রাক্টর ও ওয়ার্কসপ সুপার পদে ৮৭৬ জন কর্মরত শিক্ষকদের চাকুরি বর্তমানে হুমকির মুখে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বিনির্মাণে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ, ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে কারিগরি শিক্ষাকে ধরা হয় মূল হাতিয়ার।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কারনে কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে কিছু জটিলতায় এবং নিয়মের কারনে কারিগরি শিক্ষায় ধ্বস নামবার আশংকা রয়েছে।

বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০১০ সালে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হার ছিল ১.৮৯-২%, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, ২০২০ সালের মধ্যে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষায় নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে সরকার কারিগরি শিক্ষার হার ২০২০ সালে ২০%, ২০৩০ সালে ৩০% এবং ২০৪১ সালে ৫০% এ উন্নীত করার জন্য বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। যার ধারাবাহিকতায় সরকারি পলিটেকনিক সমূহে শিক্ষক স্বল্পতা নিরসনকল্পে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রাণালয়াধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “স্কিলস এ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট” প্রকল্প গ্রহণ করে। শিক্ষক/শিক্ষিকা স্বল্পতা দূরীকরণের জন্য উক্ত প্রকল্পের আওতায় “ডিসেম্বর-২০১২/সেপ্টম্বর-২০১৪” ১ম ও ২য় পর্যায়ে জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর, ইনস্ট্রাক্টর ও ওয়ার্কসপ সুপার পদে বিপুল পরিমান শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগ দেয়া হয়। দীর্ঘ সাত বছরে তাদের পেডাগজি, সাবজেক্টিভ, ইন-হাউজ ও বিদেশ হতে প্রাপ্ত ট্রেনিং এর মাধ্যমে দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনে অভিজ্ঞ শিক্ষক/শিক্ষিকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যাতে তারা কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে তথা ২০২১ সালের মধ্যম আয়ের দেশ ও ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে সরকারের লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রাখতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, “স্কিলস এ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট” (STEP) বাস্তবায়নের ফলে কারিগরি শিক্ষার গুনগত মান পরিবর্তনের সাথে যেমন বেড়েছে পাশের হার এবং সেই সাথে কারিগরি শিক্ষার হার প্রায় ১৫% এ উন্নীত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উদ্যোমী ও উদ্ভাবনী মনন সম্পন্ন শিক্ষক/শিক্ষিকাদের সহায়তায় ছাত্র/ছাত্রীরা বিভিন্ন উদ্ভাবনী মুলক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে যেমন কারিগরি শিক্ষার সুনাম যেমন বয়ে আনছে, তেমনি পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড স্কিলস কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ নিমিত্তে কিছুসংখ্যক ছাত্র/ছাত্রী প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

শুরুতে প্রকল্পটির মেয়াদ জুন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত থাকলেও পরবর্তীতে দুই ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে জুন-২০১৯ সাল পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে প্রকল্প কর্তৃক নিয়োজিত ৮৭৬ জন শিক্ষক/শিক্ষিকাদের অবদান আজ কারিগরি খাতে সর্বজন স্বীকৃত। বর্ণিত প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালে সমাপ্ত হলে দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক/শিক্ষিকার পদ শুন্য হয়ে পড়বে। ফলশ্রুতিতে কারিগরি শিক্ষা খাতে মারাত্মক শিক্ষক/শিক্ষিকা সংকট দেখা দেবে । এতে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এটি চুড়ান্তভাবে ২০২০ সালে সরকার নির্ধারিত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর হার ২০ভাগে উন্নীতকরণ লক্ষমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে সংশ্লিস্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন । প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি, কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় এই যে, মেয়াদ শেষে নিয়োগ প্রাপ্ত প্রকল্প ভিত্তিক শিক্ষক/শিক্ষিকাদের চাকুরি নিশ্চয়তার সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ইতোমধ্যে দুই বার মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে অধিকাংশ শিক্ষক/শিক্ষিকাদের চাকুরিতে প্রবেশের বয়সসীমা অতিক্রম করেছে। এই বিপুল সংখ্যক দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং কর্মঠ শিক্ষক/শিক্ষিকাগণ পরিবার পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে
দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে।

এমতাবস্থায়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় “স্কিলস এ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট” (STEP) শীর্ষক প্রকল্পে কর্মরত শিক্ষক/শিক্ষিকাগণের চাকুরি রাজস্বখাতে আত্মীকরণের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার প্রসার এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখবার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টজনেরা।