আশ্রয়ের ৬০ বছর পর কেন ভারত ছাড়ছে তিব্বতিরা?

চীনা আগ্রাসনের ফলে ৬০ বছর আগে তিব্বতিরা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেই আশ্রয়ের ফলে তারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ তিব্বতিদের।আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বছর থেকেই কুনসাং তেনজিং (৩৪) তার পরিবার ও বন্ধুদের মতো ভারত ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে ভারতে তিব্বতি শরণার্থী সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৪৪ শতাংশ কমে গেছে। ২০১১ সালে তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার; বর্তমানে তা ৮৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

তিব্বতি কতৃপক্ষ বলছে, বেশিরভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে আবার মাতৃভূমি তিব্বতেও ফিরে যাচ্ছেন। সারাবিশ্বের প্রায় ৪০ দেশে ১ লাখ ৫০ হাজারের মত তিব্বসি অভিবাসী রয়েছে।

১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে তিব্বতে চীনের আগ্রাসনের ফলে ভারতে আশ্রয় নেয় তারা। চলতি বছর তারা ভারতে শরণার্থী হয়ে আসার হীরক জয়ন্তী উৎসব পালন করবে।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি এভাবে ভারত ছেড়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার অভিবাসন পক্রিয়া চলতে থাকে তাহলে আধ্যাত্নিক নেতা দালাই লামার মুখপানে চেয়ে এখনো যারা ভারতে অবস্থান করছেন সেই তিব্বতি সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত কী হবে? তবে এটা নিয়ে নিজেরাও সন্দিহান তারা।

তিব্বতিদের এখনো সরকারিভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি ভারত সরকার। ফলে তাদেরকে আজও  বিদেশী বলেই গণ্য করা হয়। সেহেতু ভারতে অর্থ উপার্জন বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। সেখানে তাদের জন্য খুব কম চাকরির ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তেনজিং

১৯৫১ সালের শরণার্থী সম্মেলনের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ভারত।

ভারতের ধর্মশালায় নির্বাসিত তিব্বতি সরকার সেন্ট্রাল তিব্বতিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের  (সিটিএ) মুখপাত্র সোনাম নর্বু দাগপো বলেন, ভারত সরকার তিব্বতিদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা কোনো সরকারি চাকরির সুবিধা পায় না। এমনকি অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তিব্বতি ছাত্রদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয় না।

দাকপো আরও  বলেন, ভারতে আসা তিব্বতিদের সংখ্যা দ্রুত গতিতে হ্রাস পাচ্ছে। বছরে ৩ হাজার শরণার্থীর বিপরীতে গত বছর এসেছে মাত্র ১০০ জন। আর পিছনে অর্থনৈতিক কারণটাই ভারত বিমুখতার মূল বিষয়। তিব্বতিরা এখানে সম্পদ ক্রয়, ব্যাংক ক্রেডিট পেতে অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হয় যা তাদের ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে তিব্বতিয়দের প্রতি ভারতের সমর্থন হ্রাস পাওয়ায় মানুষের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর ভারত সরকার হীরক জয়ন্তী উৎসবে আমলা ও নেতাদের উৎসবে যোগদানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিব্রত সিটিএ এই অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

উত্তর ভারতের ছোট পাহাড়ি শহর ম্যালিওড তিব্বতিদের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে বেশ পরিচিত। সেখানে বসবাসরত প্রত্যেকের জীবনেরই রয়েছে বেদনাদায়ক বিচ্ছেদের গল্প।

তিব্বত ছেড়ে আসার পর তেনজিং আশা না হারিয়ে নতুন জীবনের খোঁজে নামেন। শরণার্থী হয়ে আসা মানুষের জীবনের গল্পগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি স্টোরিস অব তিব্বতিয়ান (এসওটি) নামে গণমাধ্যমে প্লাটফর্ম তৈরি করেছেন। এর মূল বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংগ্রামের বাহিরে তাদের পরিচয় তুলে ধরা।

তিনি আরও  বলেন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়াও আমাদের জীবনের অনেক গল্প রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সংগ্রাম,সুখ-দুঃখ অনেক কিছুই রয়েছে যা আমাদের পাল্টে দিয়েছে। আমরা সামাজিকভাবে খুব দ্রুতই পরিবর্তন করছি। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বর্তমানকে লিপিবদ্ধ করে যেতে হবে।

তার তুলে ধরা তেমনই একটি আলোচিত ব্যক্তিত্ব তেনজিন চয়োকি। যিনি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। চয়োকি থার বাবা মারা যাওয়ার ১ মাস পর জানতে পারেন তার বাবার ক্যান্সার ছিল। তিনি তখন সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন ‘আমি এটি বদলাতে চাই’ যা বেশ আলোচিত হয়েছিল।

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়েসি চোয়েদন বিশ্বাস করেন এই পদক্ষেপ মৌখিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালার কাজ করবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তিব্বতি শরণার্থীদের বিষয়ে তেমন কোনো ডকুমেন্ট তৈরি হয়নি। সবসময়ই তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামকে সামনে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। কাজেই এই ধরনের পদক্ষেপ সাধারণ তিব্বতিদের বুঝতে সহায়তা করবে।