অভিযুক্ত সিনেমা পেল পরিচালক সমিতির থ্যাঙ্কস লেটার

Walton AC 10% Discount

রাহাত সাইফুল: ঢাকাই সিনেমা ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পুনরায় ফিরে পাবে চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়। অনেকেই যখন এমন স্বপ্ন দেখছিলেন, তখনই আশনি সংকেত! সব স্বপ্ন, সম্ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢাকাই সিনেমা নকল সিনেমার নোংরা থাবায় আটকা পড়েছে। সিনেমার গল্প থেকে শুরু করে সংলাপ, দৃশ্য, মারামারি এমন কি পোস্টারেও নকলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে প্রায়ই সমালোচনা, বিতর্কের ঝড় উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যমেও। সেই পালেই যেন হাওয়া দিতে চাইছেন কিছু নির্মাতা এবং শিল্পী।

ঈদ এলেই হলমুখী হয় সিনেমাপ্রেমীরা। প্রত্যেক বছর ঈদে নকল সিনেমা নিয়ে বিতর্কের মুখে পরেন নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা। এবারও এই অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলছে মালেক আফসারি পরিচালিত ও শাকিব খান অভিনীত ‘পাসওর্য়াড’। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই সমালোচনা, বিতর্কের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যমে। মালেক আফসারি নির্মিত প্রায় সব সিনেমা ভিনদেশি সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত। ‘মাস্টার মেকার’খ্যাত এই নির্মাতা নিজেই সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন। ‘অন্তর জ্বালা’ সিনেমা মুক্তির আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে সকল সিনেমা নকল। শুধু একটি সিনেমা মৌলিক। আর সেই সিনেমাটিই ফ্লপ।’

ঈদুল ফিতরে মালেক আফসারির ‘পাসওয়ার্ড’ মুক্তি পায়। তখন তিনি সিনেমাটি নকল নয় বলে জোর আওয়াজ তুলেছিলেন। এমনকি সিনেমাটি ভারতীয় কিংবা তামিল সিনেমার নকল প্রমাণ করতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন। নানা মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে সিনেমাটির বেশ হাইপ তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। ফলে দর্শক আগ্রহ নিয়ে হলে গিয়েছে। কিন্তু দেখার পর দর্শক অভিযোগ তুলেছেন- দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দি টার্গেট’ সিনেমার কাহিনি ও চিত্রনাট্য ‘পাসওয়ার্ড’ সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে।

মালেক আফসারি সিনেমাটি মুক্তির আগে আরো বলেছেন: ‘আলোচনায় আসার জন্য আমি মানুষ খুন ছাড়া সব করতে পারি’। এই নির্মাতা আলোচনায় আসার জন্য হয়তো এগুলো বলেছেন- সিনেমা সংশ্লিষ্টদের এমনটাই ধারণা। পরিচালকের অতিকথন এবং প্রচারণার এই কৌশল এখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মত দিয়েছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা। এদিকে ‘পাসওর্য়াড’ সিনেমার প্রযোজক (শাকিব-ইকবাল) এবং পরিচালকের বিরুদ্ধে সেন্সর বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য লিখিত আবেদন করেছেন নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা আনন্দ কুটুম। অভিযোগপত্রে আনন্দ উল্লেখ করেছেন, “পাসওয়ার্ড’ ছবির কোথাও উল্লেখ নেই এটি ‘দ্য টার্গেট’ ছবির কপিরাইট নিয়ে নির্মিত হয়েছে। ছবির কোথাও উল্লেখ নেই এটি বিদেশি সিনেমার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। পুনঃসেন্সরের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া যাবে যে ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিটি নকল। লোকেশন ভিন্ন হলেও দুটো সিনেমার দৃশ্যধারণ করা হয়েছে একইভাবে। গল্প, দৃশ্য, শট ও অ্যাকশনে নকলের পাশাপাশি প্রপসের ক্ষেত্রেও নকল করার প্রবণতা ছিল ছবিটির মধ্যে। যখন একজন পরিচালক বিদেশি সিনেমা নকল করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বলেন, ‘এটা নকল নয়- গবেষণা’, তখন পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতারা আশাহত হন। অন্যের গল্প এবং দৃশ্যধারণ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কি নিয়মবহির্ভূত নয়?’’

এ প্রসঙ্গে সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নিজামূল কবীর বলেন, ‘বেশ কিছু এজেন্ডা নিয়ে আমরা একসঙ্গে বসবো। পরবর্তী সভার এজেন্ডায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলে এটি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। বিষয়টি নিয়ে অনেক ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত নিয়ম হলো যেসব জায়গায় বা দৃশ্যে সমস্যা বা নকলের অভিযোগ রয়েছে সেসব দৃশ্য কেটে আবার সেন্সরে জমা দেওয়া।’

সিনেমাটির প্রযোজক ইকবাল নকলের অভিযোগপত্র নিয়ে ভাবছেন না বলে জানান। সিনেমাটি নিয়ে অভিনেতা মিশা সওদাগর বলেন, ‘কোনো সিনেমার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হলে সেটা অবশ্যই আগে বলে নেয়া উচিৎ। আমাদের দর্শক সেটাকে ভালোবাবে নিবেন বলে মনে করি।’ এদিকে ‘নকল’ বিষয়টিকে ‘গবেষণা’ বলে দাবি করেছেন সিনেমাটির নির্মাতা মালেক আফসারী। তার ভাষায়-‘আমি কোনো পণ্ডিত-ব্যারিস্টার না। আমি কোনো মৌলিক সিনেমা বানাই না। আমি ১০টা সিনেমা দেখে একটা সিনেমা বানাই! আপনি যখন ডক্টরেট ডিগ্রি নেবেন তখন কী করবেন; লাইব্রেরিতে গিয়ে ১০০টা বই ঘাঁটবেন। এরপর নিজে একটা কিছু লিখে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে যাবেন। ঠিক ব্যাপারটা এমন। এটা একটা গবেষণা। এটাকে গবেষণা বলে, নকল না!’

ভিনদেশি সিনেমার গল্প থেকে শুরু করে সংলাপ, দৃশ্য, মারামারি এমন কি পোস্টারেও নকল করা হচ্ছে অহরহ। বিষয়টি আমলে নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। তারই ফলশ্রুতিতে নতুন গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা অন্বেষণের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। উল্টোদিকে এই পরিচালক সমিতি থেকেই নকলের অভিযুক্ত ‘পাসওর্য়াড’ সিনেমার প্রযোজককে ধন্যবাদ পত্র দেয়া হয়েছে! এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- সিনেমার প্রশংসাপত্র পরিচালককে না দিয়ে প্রযোজককে কেন? তাছাড়া একটি অভিযুক্ত সিনেমা কীভাবে থ্যাঙ্কস লেটার পায়? জানতে চাইলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘চলচ্চিত্রের দুরবস্থায় সিনেমাটি ব্যবসায়িকভাবে ভালো যাচ্ছে বলে আমরা প্রশংসাপত্র দিয়েছি। নকল বা মৌলিক গল্প নিয়ে আমরা এটি দেইনি।’

২০১৪ সালে ঈদে শাকিব খানের নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম মুক্তি পায় ‘হিরো: দ্য সুপারস্টার’। শাকিব খান প্রযোজিত ও বদিউল আলম খোকন পরিচালিত এ সিনেমাটি তেলেগু ভাষার ‘রেবেল’ সিনেমার নকল। ২০১৫ সালে ঈদে ‘রাজা বাবু’ মুক্তি পায়। এটিও ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া তামিল সিনেমা ‘ডাম্মু’ থেকে নকল করা হয়েছে। এই সিনেমাটিও পরিচালনা করেন বদিউল আলম খোকন। আবদুল্লাহ জহির বাবুর চিত্রনাট্যে নির্মিত ‘পাসওয়ার্ড’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাকিব খান, বুবলী, মিশা সওদাগর, অমিত হাসান প্রমুখ। দেশের ১৭৭টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি।

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ জুন ২০১৯/রাহাত/তারা

Source